গিরিশচন্দ্র ঘোষ (নাট্যাচার্য) | জীবন ও নাটকের তথ্য

বাংলা নাট্যসাহিত্যের ধারায় সবিশেষ উল্লেখযোগ্য নাট্যাচার্য গিরিশচন্দ্র ঘোষ। এই আলোচনায় নাট্যকারের সংক্ষিপ্ত জীবন কথা ও তাঁর রচিত নাটকের সঠিক তথ্য পরিবেশিত হয়েছে। সঙ্গে আছে গুরুত্বপূর্ণ নাটকের বিষয়বস্তু। নাট্যকারের উপনাম, ছদ্মনাম ও সম্পাদিত পত্রিকার তথ্যও পাবেন পাঠক পাঠিকা। সম্পূর্ণ জানতে পুরোটা পড়ুন।

গিরিশচন্দ্র ঘোষ – জীবন কথা

জন্ম – ২৮ ফেব্রুয়ারি, ১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দ, বাগবাজার, কলকাতা
পিতা ও মাতা – নীলকমল ঘোষ, রাইমণি দেবী
দাম্পত্যসঙ্গী – প্রমোদিনী দেবী (শ্যামপুকুর নিবাসী নবীনচন্দ্র সরকারের কন্যা), সুরতকুমারী দেবী (উত্তর কলকাতার সিমলা অঞ্চলের বিহারীলাল মিত্রের কন্যা)
সন্তান – সুরেন্দ্রনাথ ঘোষ (দানী বাবু)
নাট্যজগতে প্রবেশ – মাইকেল মধুসূদন দত্ত রচিত ‘শর্মিষ্ঠা’ নাটকে গীত রচনার মধ্য দিয়ে
মৃত্যু – ৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯১২ খ্রিস্টাব্দ, বৃহস্পতিবার

উপনাম – বাংলার গ্যারিক (‘সাধারণী’ পত্রিকায় উদ্ধৃত), নাট্যাচার্য, ভক্ত ভৈরব

ছদ্মনাম – মুকুটাচরণ মিত্র, রামতারণ সান্যাল

সম্পাদনা – ‘সৌরভ’ পত্রিকা (১৩০২ বঙ্গাব্দ)

গিরিশচন্দ্র ঘোষের নাটক

আগমনী (১৮৭৭), অকালবোধন (১৮৭৭), দোললীলা (১৮৭৮), মায়াতরু (১৮৮১), মোহিনী প্রতিমা (১৮৮১), আনন্দ রহো (১৮৮১), রাবণবধ (১৮৮১), সীতার বনবাস (১৮৮২), অভিমন্যুবধ (১৮৮১), লক্ষ্মণ-বর্জ্জন (১৮৮২), সীতার বিবাহ (১৮৮২), রামের বনবাস (১৮৮২), সীতাহরণ (১৮৮২), ভোটমঙ্গল (১৮৮২), মলিনমালা (১৮৮২), পাণ্ডবের অজ্ঞাতবাস (১৮৮৩), ব্রজবিহার (১৮৮৩), বৃষকেতু (১৮৮৪), হীরার ফুল (১৮৮৪), চৈতন্যলীলা (১৮৮৬), নল-দময়ন্তী (১৮৮৭), বুদ্ধদেবচরিত (১৮৮৭), বেল্লিক-বাজার (১৮৮৭), বিল্বমঙ্গল ঠাকুর (১৮৮৮), রূপসনাতন (১৮৮৮), পূর্ণচন্দ্র (১৮৮৮), বিষাদ (১৮৮৯), দক্ষযজ্ঞ (১৮৮৯), প্রফুল্ল (১৮৮৯), হারানিধি (১৮৯০), কমলে কামিনী (১৮৯১), মলিনা-বিকাশ (১৮৯১), মহাপূজা (১৮৯১), ধ্রুব-চরিত্র (১৮৯২), নিমাই সন্ন্যাস (১৮৯২), প্রভাসযজ্ঞ (১৮৯২), চণ্ড (১৮৯৩), শ্রীবৎসচিন্তা (১৮৯৩), মুকুলমুঞ্জরা (১৮৯৩), আবু হোসেন (১৮৯৩), আলাদিন (১৮৯৪), সপ্তমীতে বিসর্জন (১৮৯৪), জনা (১৮৯৪)

বড়দিনের বকশিস (১৮৯৪), স্বপ্নের ফুল (১৮৯৪), সভ্যতার পাণ্ডা (১৮৯৪), করমেতি বাঈ (১৮৯৫), ফণীর মণি (১৮৯৬), পাঁচ কনে (১৮৯৬), কালাপাহাড় (১৮৯৬), নসীরাম (১৮৯৬), হীরক জুবিলী (১৮৯৭), পারস্য প্রসূন (১৮৯৭), মায়াবসান (১৮৯৮), দেলদার (১৮৯৯), পাণ্ডব-গৌরব (১৯০০), মণিহরণ (১৯০০), নন্দদুলাল (১৯০০), অশ্রুধারা (১৯০১), মনের মতন (১৯০১), অভিশাপ (১৯০১), শান্তি (১৯০২), ভ্রান্তি (১৯০২), আয়না (১৯০৩), সৎনাম (১৯০৪), হরগৌরী (১৯০৫), বলিদান (১৯০৫), সিরাজদ্দৌলা (১৯০৬), বাসর (১৯০৬), মীর কাসিম (১৯০৬), য্যায়সা-কা-ত্যায়সা (১৯০৭), ছত্রপতি শিবাজী (১৯০৭), শাস্তি কি শান্তি (১৯০৮), শঙ্করাচার্য্য (১৯১০), অশোক (১৯১১), তপোবল (১৯১১)

অসমাপ্ত নাটক – গৃহলক্ষ্মী (১৯১২), রাণা প্রতাপ

জনা নাটকের বিষয়বস্তু

গিরিশচন্দ্র ঘোষের পৌরাণিক নাটকের মধ্যে ‘জনা’ শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। নাটকের মুখ্য উদ্দেশ্য ভক্তিরস সৃষ্টি করা হলেও এই নাটকে আছে দ্বন্দ্ব, বাস্তব আবেগ ও প্রবৃত্তির ঘাত-প্রতিঘাত। জনা ও প্রবীরকে কেন্দ্র করে চরিত্রের দ্বন্দ্ব, বাস্তবতা যেমন সৃষ্টি হয়েছে তেমনি নীলধ্বজ, বিদূষক চরিত্রের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে ভক্তিরস। প্রবীরের বীরত্ব, দ্বেশাত্মবোধ, মাতৃভক্তি লৌকিক রসে অভিষিক্ত। অন্যদিকে আবার জনার পুত্রপ্রেম, স্বদেশানুরাগ, নীলধ্বজের বিরোধিতা, পুত্রহত্যার প্রতিহিংসা একান্তই বাস্তব-রসে জারিত।

নাটকে জনা চরিত্রের ট্র্যাজিক পরিমাণের সূচনা হয়েছে প্রবীরের পাণ্ডবদের যজ্ঞাশ্ব ধরার মধ্য দিয়ে। অর্জুন বিখ্যাত বীর। যজ্ঞাশ্ব ধরে তার সঙ্গে যুদ্ধ করে জয়ী হওয়া প্রবীরের পক্ষে সম্ভব নয়। বস্তুত শ্রীকৃষ্ণ ভারতে ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে চান, আর সেই কর্মে প্রবীর হত্যা আবশ্যক হয়ে পড়ে। এই প্রবীরের নিহত হওয়ার পরেই জনা চরিত্রের প্রতিশোধস্পৃহা দেখা যায়। এই সময় জনা একেবারে নিঃসঙ্গ। শেষ পর্যন্ত পুত্রের মৃত্যুর মর্মজ্বালা বুকে নিয়ে সে গঙ্গায় আত্মবিসর্জন করে।

নাটকের মূল আকর্ষণীয় চরিত্র অবশ্যই জনা। ড. অজিতকুমার ঘোষ লিখেছেন, ‘জনা চরিত্রটি প্রতিকূল অবস্থার সহিত অবিচ্ছিন্ন সংগ্রাম, সুতীব্র অন্তর্দ্বন্দ্ব, সুগভীর বেদনা ও অতৃপ্ত প্রতিহিংসার মধ্য দিয়া একটি শ্রেষ্ঠ ট্র্যাজিক চরিত্রে পরিণত হইয়াছে।’ চরিত্রটির মধ্যে আমরা যেমন স্নেহশীলা জননীর রূপ দেখি তেমনি পাই তার বীরাঙ্গনা মূর্তি।

প্রফুল্ল নাটকের আলোচনা

গিরিশচন্দ্র ঘোষ রচিত সামাজিক নাটকগুলির মধ্যে শ্রেষ্ঠ ‘প্রফুল্ল’। নাটকে তৎকালীন কলকাতার নাগরিক জীবনের ছবি ও মধ্যবিত্ত সমাজের ভাঙন প্রাধান্য পেয়েছে। কলকাতার এক প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি যোগেশ। তার একান্নবর্তী পরিবার। নিজ প্রতিভা ও বুদ্ধি দিয়ে সে প্রভুত সম্পত্তির মালিক হয়। যে ব্যাঙ্কে যোগেশ তার সমস্ত অর্থ গচ্ছিত রেখেছিল তা আচমকাই বন্ধ হলে যোগেশ উন্মাদপ্রায় হয়ে পড়ে। দিন-রাত মদ্যপান পেয়ে বসে তাকে। এদিকে পেশায় উকিল, যোগেশের মেজো ভাই রমেশ সমস্ত সম্পত্তি নিজের নামে করে নেয়। ফলে যোগেশের বিপর্যয় চরমে ওঠে। পরিণামে নিদারুণ হাহাকার শোনা যায় তার কণ্ঠে – ‘আমার সাজানো বাগান শুকিয়ে গেল।’

নাটকের প্রধান বিষয়বস্তু যোগেশের বিপর্যয়ের কাহিনি হলেও নাটকের নামকরণ হয়েছে রমেশের স্ত্রী প্রফুল্লের নামে। আসলে স্বামীকে কুকর্মের হাত থেকে রক্ষা করতে গিয়ে স্বামীর হাতেই প্রফুল্লর মৃত্যু হয়েছে। তার করুণ পরিণাম গোটা সংসারকে করেছে বিপর্যস্ত।

সিরাজদ্দৌলা নাটক

নাট্যাচার্য গিরিশচন্দ্রের ঐতিহাসিক নাটকের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ‘সিরাজদ্দৌলা’। তাঁর এই নাটক রচনাকালে বাংলা নাট্যসাহিত্যের স্বর্ণযুগ চলছে। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদের নাটক বাঙালি-চিত্তকে অনুরণিত করে তুলছে। গিরিশচন্দ্রও তাঁর আপন প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে চললেন তাঁর ঐতিহাসিক নাটক রচনার মধ্য দিয়ে।

নাটকের নায়ক অবশ্যই সিরাজদ্দৌলা। নাটকের সূত্রপাত সিরাজের সিংহাসন প্রাপ্তির সময় থেকে আর সমাপ্তি হয়েছে তার শোচনীয় পরিণাম ও মীরজাফরের মসনদ লাভের ঘটনা দিয়ে। এই নাটকে সিরাজদ্দৌলা প্রজাপ্রেমিক নবাব, একজন যথার্থ পিতা ও যথার্থ স্বামী হিসেবে চিত্রিত হয়েছে। কিন্তু চরিত্রটির মূল ত্রুটি হল মীরজাফরকে ষড়যন্ত্রকারী জেনেও তার শাস্তিবিধান করতে না পারা। আর এই ত্রুটির কারণেই তার উপর নেমে আসে ট্র্যাজেডির পরিণাম। দেশমাতৃকাকে ইংরেজদের কবল থেকে মুক্ত করতে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। সিরাজের শোক সমস্ত জাতির শোকে পরিণত হয়েছে। নাটকে বীররস ছাপিয়ে উঠেছে করুণ রস।


আলোচক – নীলরতন চট্টোপাধ্যায়


বাংলা সাহিত্যের সমগ্র ইতিহাস ও ব্যাকরণের তথ্য এখন হাতের মুঠোয়। ডাউনলোড করুন আমাদের মোবাইল অ্যাপ।

Target Bangla Android App

Leave a Reply