মনসামঙ্গল কাব্য বাংলা সাহিত্যে মধ্যযুগের ধারায় এক অনন্য সৃষ্টি ধারা। আমাদের এই আলোচনায় মনসামঙ্গল কাব্যের প্রধান প্রধান কবিদের নানা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিবেশিত হয়েছে। তথ্যগুলি বাংলা সাহিত্যের রসিক পাঠক পাঠিকা তথা ছাত্রছাত্রীদের উপকারে লাগবে বলেই আমাদের বিশ্বাস। পাঠ শেষে আপনার প্রতিক্রিয়া জানান কমেন্ট বক্সে।
বিজয়গুপ্ত
মনসামঙ্গলের কবি হিসেবে বিজয়গুপ্তের নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। কবি বর্তমান বাংলাদেশের বরিশালের গৈলা ফুল্লশ্রী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি নিজেকে ‘সনাতন তনয় রুক্মিণী গর্ভজাত’ বলে পরিচয় দিয়েছেন। কবি মনসার ভক্ত ছিলেন বলে প্রচারিত।
বিজয়গুপ্তের কাব্যটির নাম ‘পদ্মাপুরাণ’। এই কাব্যে একটি শ্লোকটি পাওয়া যায়, তা হল –
‘ঋতু শূন্য বেদ শশী পরিমিত শক।
সুলতান হুসেন শাহ নৃপতি তিলক।।’
কারো কারো মতে শ্লোকের প্রথমাংশটিতে লিপিগত ত্রুটি ঘটেছে। যাইহোক বিজয়গুপ্তের কাব্য রচনাকাল ১৪৯৪ খ্রিস্টাব্দ স্থির হয়েছে। কাব্যটি ১৩০৩ বঙ্গাব্দে (মতান্তরে ১৩৩৭ বঙ্গাব্দে) প্যারীমোহন দাশগুপ্ত বরিশাল থেকে প্রকাশ করেন।
নারায়ণদেব
নারায়ণদেব মনসামঙ্গল কাব্যধারার সুপরিচিত কবি। তাঁর কাব্য সর্বাধিক প্রচারিত হয়েছিল। কাব্যের প্রথম খণ্ডে প্রদত্ত কবির আত্মপরিচয় থেকে জানা যায় যে ‘দেব’ উপাধিক কায়স্থ কবির পূর্বপুরুষের নিবাস ছিল রাঢ়দেশ। পরে তাঁরা ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জ মহকুমার বোরগ্রামে বসবাস শুরু করেন। কেউ কেউ কবিকে ময়মনসিংহের অধিবাসী বলতে চেয়েছেন, আবার কেউ শ্রীহট্টের। কেউ আবার কবিকে অসমবাসী বলে দাবি করেছেন। কবির পিতার নাম নরসিংহ, মাতা রুক্মিণী দেবী। কবির উপাধি – সুকবিবল্লভ।
কাব্য পরিচয় – নারায়ণদেবের কাব্যের নাম ‘পদ্মাপুরাণ’। তিন খণ্ডে বিভক্ত ‘পদ্মাপুরাণে’র প্রথম খণ্ডে কবির আত্মপরিচয় পাওয়া যায়। দ্বিতীয় খণ্ডে আছে পৌরাণিক আখ্যান এবং তৃতীয় খণ্ডে চাঁদ সদাগরের কাহিনি। আসামের অন্তর্গত ব্রহ্মপুত্র ও সুর্মা উপত্যকা অঞ্চলে কবির কাব্য ‘সুকনান্নি’ বা ‘হুকনান্নি’ নামে পরিচিত। ১২৮৪ বঙ্গাব্দে শ্রীহট্ট থেকে ভৈরবচন্দ্র শর্মার সম্পাদনায় নারায়ণদেবের পদ্মাপুরাণ সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয়।
নারায়ণদেবের কাব্যে আছে কালিকাপুরাণ, শিবপুরাণ, কুমারসম্ভব কাব্যের প্রভাব। কবি বেহুলা চরিত্রটিকে সুচিত্রিত করেছেন। হাস্য ও করুণ রসের সৃষ্টিতে কবির দক্ষতা ধরা পড়েছে। কবি কাব্যের সমাপ্তি করেছেন চাঁদ সদাগরকে দিয়ে মুখ না ফিরিয়ে বাম হাতে মনসার পুজো করার মধ্য দিয়ে। নারায়ণদেবকেই অনেকে মনসামঙ্গলের শ্রেষ্ঠ কবি বলে থাকেন। আশুতোষ ভট্টাচার্য লিখেছেন, “নারায়ণদেবের রচনায় স্বভাব-স্ফূর্ত সরস কবিত্বের যেমন পরিচয় পাওয়া যায়, তেমনই তাহাতে পাণ্ডিত্যের পরিচয়ও দুর্লভ নহে।”
দ্বিজ বংশীদাস
দ্বিজ বংশীদাস বর্তমান বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জ মহকুমার পাতুয়ারী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ‘মহিলা কৃত্তিবাস’ হিসেবে পরিচিত কবি চন্দ্রাবতী ছিলেন তাঁর কন্যা। চন্দ্রাবতী তাঁর রামায়ণ অনুবাদে পিতার পরিচয় দিয়ে লিখেছেন ফুলেশ্বরী নদীর তীরে যাদবানন্দ ও অঞ্জনার ঘরে ভট্টাচার্য বংশে দ্বিজ বংশীদাসের আবির্ভাব হয়।
দুঃখের সংসার দূর করার জন্য কবি স্বরচিত ভাসান গান গেয়ে শোনাতেন নানা স্থানে। শোনা যায় একবার তিনি দস্যু কেনারামের কবলে পড়েন। কবি তাকে বেহুলার দুঃখের কাহিনি শোনান এবং দস্যুর হাত থেকে রেহাই পান।
কবি বংশীদাসের কাব্যের নাম ‘পদ্মাপুরাণ’। তাঁর কাব্যে কাব্যরচনাকাল-জ্ঞাপক একটি শ্লোক আছে। শ্লোকটি হল –
‘জলধির বামেত ভুবন মাঝে দ্বার।
শকে রচে দ্বিজ বংশী পুরাণ পদ্মার।।’
এই দুই ছত্র থেকে বলা যায় কবি বংশীদাস ১৪৯৭ শকে বা ১৫৭৫ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর কাব্য ‘পদ্মাপুরাণ’ রচনা করেন। কবির কাব্য আকারে বৃহৎ। কাব্যটি তন্ত্র প্রভাবিত। কাব্যের বেহুলা চরিত্র কিছুটা বাস্তবসম্মত।
কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ
মনসামঙ্গল কাব্যধারায় রাঢ়ের কবি হিসেবে জনপ্রিয় হলেন কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ। কেতকাদাস পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার কাঁথড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। কবিরা দুই ভাই ছিলেন। অন্য ভাইয়ের নাম অভিরাম। পিতার নাম শঙ্কর। তিনি বারা খাঁর কর্মচারী ছিলেন। যুদ্ধে বারা খাঁ মারা গেলে অশান্তির হাত থেকে নিস্তার পেতে তিনি দুই পুত্রকে নিয়ে পালিয়ে যান। সেই দুঃসময়ে তাদের আশ্রয়দাতা ছিলেন জগন্নাথপুরের লম্বোদর তেলি। পরে রাজা বিষ্ণুদাসের ভ্রাতা ভারমল্ল তাঁদের আশ্রয় দেন এবং তিনটি গ্রাম দান হিসেবে পান।
কেতকাদাসের কাব্য সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি রচিত হয় বলে অনুমান। কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ তাঁর কাব্যে বেহুলার যাত্রাপথের বর্ণনায় যে ২২টি গ্রামের নাম উল্লেখ করেছেন তার মধ্যে ১৪টির নাম এখনও দামোদর নদের উভয়তীরে বর্তমান। কবির উল্লেখিত বর্ধমান, মণ্ডলগ্রাম, বৈদ্যপুর, গোবিন্দপুর, হাসনহাটি প্রভৃতি স্থান মনসা পুজোর জন্য আজও বিখ্যাত।
সমস্ত মনসামঙ্গল কাব্যের মধ্যে কেতকাদাসের কাব্যই প্রথম মুদ্রিত হয়। কাব্যে আছে কবির পাণ্ডিত্যের পরিচয়। বেহুলা চরিত্রের দুঃখ বর্ণনায় কবি সার্থক করুণ রসের সৃষ্টি করেছেন। তাঁর সৃষ্ট চাঁদ সদাগরের চরিত্রে আছে দৃঢ়তা। রচনারীতির কিছু স্থানে আছে মুকুন্দ চক্রবর্তীর প্রভাব।
বিপ্রদাস পিপলাই
বিপ্রদাস পিপলাই চব্বিশ পরগণার বাদুড়্যা বটগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। কবির পিতার নাম মুকুন্দ পণ্ডিত। কবিরা চার ভাই। তাঁর কাব্যে কাব্যরচনাকাল-জ্ঞাপক যে শ্লোকটি পাওয়া যায় তা হল –
সিন্ধু ইন্দু বেদ মহী শক পরিমাণ
নৃপতি হুসেন শা গৌড়ের সুলতান।।’
উক্ত বিবরণ থেকে বোঝা যায়, ১৪১৭ শকে বা ১৪৯৫ খ্রিস্টাব্দে বিপ্রদাস তাঁর কাব্য রচনা করেন। তাঁর কাব্য রচনাকালে গৌড়ের সিংহাসনে বিরাজমান ছিলেন সুলতান হুসেন শাহ। কবি সাতটি পালায় তাঁর গীত সম্পূর্ণ করতে চেয়েছিলেন। ড. সুকুমার সেনের সম্পাদনায় ‘বিপ্রদাসের মনসাবিজয়’ প্রকাশিত হয়।
কবির কাব্যে চাঁদের বাণিজ্য-যাত্রা সম্পর্কে কিছু প্রাচীন স্থানের নাম উল্লেখ আছে। যেমন – হুগলী, ভাটপাড়া, ভদ্রেশ্বর, ইছাপুর, কোন্নগর, কামারহাটি, চিৎপুর, রিষড়া ইত্যাদি। মনসা চরিত্র সৃষ্টিতে কবি ‘করুণা ও স্নেহ-মমতা সঞ্চার’ করতে সক্ষম হয়েছেন। বিপ্রদাসের ‘মনসাবিজয়’ কাব্যে ‘মনসামঙ্গল’ ও ‘মনসাচরিত’ নাম দুটিও ব্যবহার করেছেন।
আলোচক – নীলরতন চট্টোপাধ্যায়
২০/০২/২০২৬
মঙ্গলকাব্যের গঠন সম্পর্কে পড়ুন।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের সামগ্রিক তথ্য পেতে ইনস্টল করুন আমাদের মোবাইল অ্যাপ mBook, গুগল প্লে-স্টোর থেকে।


