অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়

বাংলা সাহিত্যের ছাত্রছাত্রীরা একাডেমিক স্তরে অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের বই পড়েনি এমন বোধ হয় কেউ নেই। বিশেষতঃ তাঁর বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত বইখানি। তিনি একাধারে অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী তেমনি ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন নিরহংকারী, সহজ সরল হাস্যপ্রিয় মানুষ। আমাদের এই আলোচনায় লেখক সম্পর্কে নানা অজানা তথ্য জানতে পারবেন পাঠক পাঠিকা।

অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় – জন্ম

ইংরেজি ১৯২০ সালের ৪ঠা জুন বনগাঁর কাছে নকফুল গ্রামে মাতুলালয়ে অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম। পিতা অক্ষয়কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মাতার নাম চারুবালা দেবী। তাঁদের তিন পুত্র সন্তানের মধ্যে অসিতকুমার ছিলেন কনিষ্ঠ। দুই ভাই অনিলকৃষ্ণ ও অজিতকৃষ্ণ ছাড়া অসিত বাবুর এক বোন ছিলেন – উষা। তাঁদের পৈতৃক ভূমি ছিল উত্তর ২৪ পরগণার পোলতা গ্রামে। বাল্যকাল কাটে এখানেই।

হাওড়া আগমন

অসিতবাবু ছোটো থেকেই ম্যালেরিয়ায় ভুগতেন। শরীর ছোটো থেকেই যেন শীর্ণ হয়ে ওঠে। রোগ সারাতে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা চলে। কিন্তু জ্বর তাকে ছাড়ে না। অনেক সমস্যার পর তাঁর পিতা সপরিবারে কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। মূল লক্ষ্য পুত্রের সুচিকিৎসা।

গ্রাম থেকে বেরিয়ে গোপালপুরের ঘাট, ইছামতী পার হয়ে বনগাঁ স্টেশন। সেখান থেকে আসেন শিয়ালদা। তারপর হাওড়ায় আগমন। সালটা ছিল ১৯২৫। এই সময় থেকে আমৃত্যু তাঁর এখানেই বসবাস। প্রথমদিকে কৈলাস বোস লেনে ভাড়াবাড়ি তারপর যোগমায়া দেবী লেনে একটি দোতলা বাড়িতে তিনি থাকতে শুরু করেন।

প্রথম প্রথম হাওড়া তাঁর ভালো লাগেনি একেবারেই। ছোট্ট অসিতকুমার খুব মিস করতেন তাঁর ছায়া সুনিবিড় গ্রামটিকে। সেই উন্মুক্ত প্রান্তর, বাঙোর নদী, রথতলা, তুলসীমঞ্চ, নয়নতারা, দোপাটির অভাব বোধ করতেন। তবে শহরে এসে তাঁর যে উপকার হয়েছিল তা হল শরীর থেকে ম্যালেরিয়া বিদায় নিয়েছে। তিনি এখন সুস্থ।

শিক্ষা

তাঁর পিতা এবার পুত্রের শিক্ষার ব্যবস্থা করলেন। পাড়ার বনমালি পণ্ডিতের পাঠশালায় শুরু হল অসিতকুমারের শিক্ষারম্ভ। সরু খাতা, স্লেট, পেনসিল মাটির দোয়াত, খাগের কলম আর মাদুর। এখানে অল্প দিনেই তিনি বর্ণপরিচয়, ধারাপাত সম্পূর্ণ করলেন। অন্য সব বিষয়ে ভালো করলেও তখনও ইংরেজিতে তিনি কিছুটা দুর্বল ছিলেন।

এরপর হাওড়া বিবেকানন্দ ইনস্টিউশনে ভর্তি করা হয় তাঁকে। এখানে তাঁর প্রতি সমস্ত শিক্ষকই সন্তুষ্ট ছিলেন। বাংলা ভাষায় তাঁর আগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো। নিয়মিত সাহিত্য সভায় যোগ দিতেন। লেখালেখিও করতেন।

এরপর হাওড়া জেলা স্কুল। সেখানে পাঠ শেষ করে সুরেন্দ্রনাথ কলেজে। এখানে তিনি শিক্ষক হিসেবে পেলেন বিনোদবিহারী বন্দ্যোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে, প্রমথনাথ বিশীকে। ১৯৪২ সালে তিনি জুবিলি স্কলারশিপ সহ বাংলা অনার্সে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হোন। এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম.এ পড়ার জন্য ভর্তি হলেন। এই সময় তিনি শিক্ষক হিসেবে পেলেন খগেন্দ্রনাথ মিত্র, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, শশীভূষণ দাশগুপ্ত, মণীন্দ্রমোহন বসু প্রমুখদের। তবে তিনি তাঁর শিক্ষাগুরু হিসেবে বরণ করে নিয়েছিলেন শশীভূষণ দাশগুপ্তকে।

কর্মজীবন

অধ্যাপক হিসেবে অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের কর্মজীবন শুরু হয় নবদ্বীপ কলেজে। এরপর বঙ্গবাসী কলেজ, তারপর সুরেন্দ্রনাথ কলেজে তিনি অধ্যাপনা করেন। এরপর ১৯৫৬ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে লেকচারার পদে যোগ দেন। ১৯৫৭ সালে শিক্ষাগুরু শশীভূষণ দাশগুপ্তর অধীনে গবেষণা করে পি.এইচ.ডি ডিগ্রী লাভ করেন।

তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল ‘ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ ও বাংলা সাহিত্য’। এখানে তাঁর সহকারী অধ্যাপক ছিলেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় ও তাঁরই একসময়ের শিক্ষক প্রমথনাথ বিশী। এরপর ১৯৬৭ সালে রিডার ও ১৯৭১ সালে তিনি UGC অধ্যাপক হোন। ১৯৮৫ সালের সেপ্টেম্বরে অবসর নেন এবং ঐ বছরের অক্টোবর থেকে এশিয়াটিক সোস্যাইটির সিনিয়র ফেলো এবং বঙ্কিমচন্দ্র গবেষণা অধ্যাপক নিযুক্ত হোন।

গ্রন্থাবলী

লেখক অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় বহু গ্রন্থের প্রণেতা। সম্পাদনাও করেছেন অনেক বই। আমরা নীচে তাঁর গ্রন্থের যথাসম্ভব তালিকা দিলাম।

ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ ও বাংলা সাহিত্য
বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত (১০ খণ্ড)
উনিশ-বিশ
চিন্তা-বিচিত্রা
প্রাচীন বাঙালী ও বাংলা সাহিত্য
বিদ্যাসাগর ও বাংলা সাহিত্য
সমালোচনার কথা
শরৎ প্রসঙ্গ ও অন্যান্য প্রবন্ধ
বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতা
হাওড়া শহরের ইতিবৃত্ত (২টি খণ্ড)

আত্মজীবনী – স্মৃতির উজানে, স্মৃতি বিস্মৃতির দর্পণে

অনঙ্গমোহন খোশনবিস ছদ্মনামে লেখা ‘কমলাকান্তের বঙ্গদর্শন’

গল্প – ‘একদিন’ – দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত

পুরস্কার ও সম্মান

হাওড়া রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ আশ্রম থেকে তারাপদ বসু স্মৃতি পুরস্কার
পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক বিদ্যাসাগর স্মৃতি পুরস্কার
নেতাজি অ্যাওয়ার্ড
অমৃতবাজার পত্রিকার পক্ষ থেকে শিশিরকুমার অ্যাওয়ার্ড
এশিয়াটিক সোস্যাইটির স্যার উইলিয়ম জোনস্‌ স্বর্ণপদক
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগত্তারিণী পুরস্কার

শেষ জীবন

সালটা ছিল ২০০৩। এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দেওয়ার সময় হাঁফানিতে আক্রান্ত হোন। তখন বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্তের দশম খণ্ডের কাজ চলছে। রবীন্দ্রনাথের বলাকা কাব্যের ‘জীবন-মরণ’ কবিতার মর্মার্থ বর্ণনা চলছে। রাত্রের মতো লেখা শেষ করে শয্যা নিলেন। সেই শেষবারের মতো। ১৫ই মে-এর সেই মধ্যরাতে তাঁর মহাপ্রয়াণ হল। ভোরে ‘আকাশবাণী’তে শোনা গেল সেই দুঃসংবাদ।


অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ও বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত

Leave a Reply