প্রবাদ লোকসাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বিশ্বের বিভিন্ন ভাষাতেই প্রবাদের প্রচলন আছে। কিন্তু বাংলার প্রবাদ যেন সর্বক্ষেত্রে অনন্য। আমাদের আজকের আলোচনায় বাংলার প্রবাদের সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য ও নানা উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে।
প্রবাদ কী ?
‘প্রবাদ’ শব্দের ব্যুৎপত্তি হল প্র – বদ + অ (ঘঞ্) অর্থাৎ পরম্পরায় প্রাপ্ত কোনো বাক্য, লোককথা বা জনশ্রুতি।’ যে সকল উক্তি লোক পরম্পরায় জনশ্রুতি হিসেবে চলে আসছে, তাই হল প্রবাদ। এগুলি আসলে আমাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার একটি সংক্ষিপ্ত রসজ্ঞ প্রকাশ। ইংরেজিতে বলা যায় – ‘A proverb is a saying, usually short, that expresses a general truth about life.’ অথবা ‘A Proverb is a short sentence, based on long experience.’ প্রবাদ একদিকে যেমন প্রাচীন, অন্যদিকে তেমনই আধুনিক।
সাধারণত মানুষের বহুদর্শিতা বা দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করেই প্রবাদের উদ্ভব হয়। এর প্রধান বিষয় মূলত মানব জীবন। একটি জাতির সত্যতা, রসবোধ, ঐতিহ্যগত দিক এবং মূল্যবোধ দীর্ঘদিন ধরে লোকমুখে প্রচলিত হয়ে প্রবাদ রূপে সার্বিক গ্রহণযোগ্যতা পায়। একটি জাতির সংস্কৃতির দর্পণ এই প্রবাদ। স্থানীয় পরিবেশ, সংস্কার, চিন্তাভাবনা, রুচিবোধ, ধর্মবিশ্বাস থেকে লোকাচার, জীবিকা ইত্যাদি সমস্ত কিছুই প্রকাশ পায় প্রবাদের মধ্য দিয়ে। তাই তো বাংলায় এত বহুল ও বিচিত্র প্রবাদের ব্যবহার দেখা যায়।
উদ্ভব
প্রবাদ মানুষের মস্তিষ্ক থেকে তার বাস্তব অভিজ্ঞতা দিয়ে সৃষ্ট। প্রবাদের দুটি অর্থ – একটি আক্ষরিক, অন্যটি ব্যঞ্জনা। ব্যঞ্জনাতেই তার সৌন্দর্য্য। প্রবাদের শিকড় আমাদের ঐতিহ্যে আর লোকের মুখে মুখেই এর প্রচার ও প্রসার। এক সংক্ষিপ্ত, সরল অথচ সরস অভিজ্ঞতায় পূর্ণ এই প্রবাদ। এগুলি একটি জাতি বা সমাজের দীর্ঘ ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা-জাত রস ও লৌকিক অভিজ্ঞতার ফসল। জাতি বা জনগোষ্ঠীর অমূল্য সম্পদ। সহজ বোধগম্যতায়, সরল প্রকাশে এবং অর্থবহ বক্তব্যের কারণেই দেশে দেশে প্রবাদ এত জনপ্রিয়।
ড. আশুতোষ ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘প্রবাদে রূপক অলঙ্কারের ব্যাপক প্রয়োগ হয়।’ তবে রূপক ছাড়াও অন্যান্য অলঙ্কারেরও প্রয়োগ আছে। যেমন অনুপ্রাস। যেমন – কাজের নামে নেই কাজী / অকাজ পেলে তাতেই রাজী। এখানে ‘জ’ এর অনুপ্রাস ঘটেছে।
বৈশিষ্ট্য
১. প্রবাদ লোক সাধারণের উক্তি।
২. একটি জাতির দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, বুদ্ধি, প্রকাশিত হয়।
৩. আকারে সংক্ষিপ্ত বাক্য বা কিছু শব্দগুচ্ছের সমন্বয়
৪. প্রবাদ জাতির ঐতিহ্যকেন্দ্রিক
৫. রূপক, উপমা, অতিশয়োক্তি, বক্রোক্তি ও বিরোধাভাস অলংকারের ব্যবহার হয়।
৬. অবান্তর শব্দ বা বাক্য ব্যবহৃত হয় না।
মূল্য
প্রাজ্ঞদের মুখে মুখে তৈরি অভিজ্ঞতালব্ধ এই প্রবাদ যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। তা সহজ সরল বোধগম্য ভাষায় বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা, দুঃখ-বেদনা, আশা-নিরাশার প্রকাশক। এগুলি মানব জীবনের সঙ্গে সঙ্গে সাহিত্যেরও প্রয়োজনীয় ও জনপ্রিয় উপাদান। দৈনন্দিন জীবনধারায় এর রসাবেদন কালজয়ী।
উদাহরণ
১. অগাধ জলের মাছ
২. কুম্ভকর্ণের নিদ্রা
৩. গোকুলের ষাঁড়
৪. অগস্ত্য যাত্রা
৫. জড়ভরত
৬. হরিহর আত্মা
৭. একলা মায়ের ঝি / গরব করব না তো কী
৮. এক বিয়ের মাগ নাড়ে চাড়ে / দোজবরের মাগ পুড়িয়ে মারে।
৯. কাজীর কাছে হিঁদুর পরব।
১০. দশদিন চোরের, একদিন সাউধের
১১. চকচক করলেই সোনা হয় না
১২. বিনা মেঘে বজ্রপাত
১৩. তিলকে তাল করা
১৪. যেমন বুনো ওল তেমনি বাঘা তেঁতুল
১৫. যার প্রতি যার মজে মন / কিবা হাড়ি কিবা ডোম
১৬. ধর্মের কল বাতাসে নড়ে
১৭. জন জামাই ভাগনা / তিন নয় আপনা
১৮. আপণা মাঁসে হরিণা বৈরী (চর্যাপদ)
১৯. ললাট লিখন খণ্ডন ন জাএ (শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য)
২০. দুষ্ট গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভালো
২১. আদা শুকালেও ঝাল যায় না
২২. উড়ে, নেড়ে, গলায় দড়ে / কথা কইবে এ তিন ছেড়ে
২৩. ওড়গাঁয়ের ডাঙা
২৪. কিনতে ছাগল বেচতে পাগল
২৫. গুরু ঘাঁটায়ে বিদ্যা পায় / মূর্খ ঘাঁটায়ে মার খায়



