ময়মনসিংহ গীতিকার জনপ্রিয় দুটি পালা হল মলুয়া ও মহুয়া। আমরা এই পোস্টে মলুয়া পালার কাহিনি ও মহুয়া পালার কাহিনি দুটি যথাসম্ভব সংক্ষিপ্ত অথচ নিটোল আকারে উপস্থাপন করেছি। অনুরোধ, পাঠক পাঠিকা প্রতিক্রিয়া দেবেন। আসুন, পালা দুটির কাহিনি জেনে নেওয়া যাক।
মহুয়া পালার কাহিনি
ময়মনসিংহ গীতিকার মহুয়া পালার কাহিনিতে দেখি গারো পাহাড়ে ডাকাতি করে জীবিকা নির্বাহ করে হুমর্যা বেদে। সে তার দলবল নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে ধনু নদীর তীরে কাঞ্চনপুর গ্রামে এসে উপস্থিত হয়। ঐ গ্রামের এক বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের শিশুকন্যাকে হুমর্যা চুরি করে নিয়ে যায়। তার না রাখে মহুয়া। মহুয়াকে সে নিজের কন্যার মতোই লালন পালন করে। ধীরে ধীরে সেই কন্যার বয়স হয় ষোল বছর।
এই সময় মহুয়া অপূর্ব সুন্দরী। তাকে সঙ্গে নিয়ে হুমর্যার দল নানা স্থানে তামাশা প্রদর্শন করতে শুরু করে। এইভাবেই একদিন তারা উপস্থিত হয় বামনকান্দা গ্রামে। এখানে ‘মহুয়া সুন্দরী’র খেলা দেখে মুগ্ধ হয় ব্রাহ্মণ-যুবক নদেরচাঁদ। এরপর জলের ঘাটে নদেরচাঁদ ও মহুয়ার পারস্পরিক সাক্ষাতে পূর্বরাগের সঞ্চার হয়। উভয়ের কথোপকথনের মাঝে নদেরচাঁদ জানায় –
‘তোমার মতো নারী পাইলে করি আমি বিয়া।’
মহুয়াও চন্দ্র-সূর্যকে সাক্ষী রেখে ‘নদ্যার ঠাকুর’ নদেরচাঁদকে ‘প্রাণের সোয়ামী’ মেনে নিয়েছে। এদিকে হুমর্যা বেদে সব জানতে পেরে সেই গ্রাম ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। মহুয়া চোখের জলে বিদায় নিল। নদেরচাঁদও মহুয়ার বিরহে দেশান্তরী হল। পথে কোনো পথিক দেখলে নদেরচাঁদ জিজ্ঞাসা করে –
‘মেঘের সমান কেশ তার তারার সমান আঁখি।
এই দেশে নি উইড়া আইছে আমার তোতাপাখী।।’
এইভাবে নানা দেশ ভ্রমণ করে অবশেষে সে কংসাই নদীর ধারে মহুয়ার সন্ধান পেল। উভয়ের সাক্ষাৎ যেন – ‘সাপে যেমন পাইল মণি পিয়াসী পাইল জল।’
কিন্তু উভয়ের পুনর্মিলন মানতে পারল না হুমর্যা বেদে। সে একদিন মহুয়ার হাতে ছুরি দিয়ে নদেরচাঁদকে হত্যা করার আদেশ দিল। কিন্তু মহুয়া তা না করে নদেরচাঁদকে সঙ্গে নিয়ে দূর দেশে পালিয়ে গেল। তারা এসে হাজির হল এক পার্বত্য নদীর সামনে। কিন্তু এখানেও ঘটল বিপত্তি। মহুয়ার রূপে মুগ্ধ হয়ে তাকে হস্তগত করতে চাইল এক অসাধু সন্ন্যাসী। মহুয়া কৌশলে সেই বিপত্তি থেকে নিজেকে ও নদেরচাঁদকে বাঁচাল।
সেখান থেকে তারা এক অরণ্যপথে পালিয়ে গেল। এখানে তারা সুখে বাস করছিল। কিন্তু হুমর্যা বেদের দল সেখানেও হাজির হয়। সে পুনরায় মহুয়াকে ‘বিষলক্ষের ছুরি’ দিয়ে নদেরচাঁদকে হত্যা করার নির্দেশ দেয়। মহুয়া অন্তর্দ্বন্দ্বে জর্জরিত হয়। শেষ পর্যন্ত মহুয়া ঐ ছুরি দিয়ে নিজেকে আঘাত করে প্রাণত্যাগ করে। কন্যার এই পরিণতিতে হুমর্যাও ক্রোধে নদেরচাঁদকে হত্যা করে। তারপর দুটি মৃতদেহই কবর দেওয়া হয়।
মলুয়া পালার কাহিনি
কাহিনির শুরুতে ‘জলপ্লাবন ও দুর্ভিক্ষে’র কথা আছে। বলা হয়েছে বারো মাসের কাহিনি। কাহিনির নায়ক চাঁদবিনোদ কুড়া শিকারে বেরিয়ে আড়ালিয়া নামক একটি গ্রামে এসে উপস্থিত হয়। একটি পুকুর পাড়ে কদমতলায় শুয়ে চাঁদবিনোদের দুপুর কাটে। ক্রমে দুপুর পেরিয়ে সন্ধ্যা হয়ে আসে। চাঁদবিনোদ ঘুমে আচ্ছন্ন। এমন সময় পুকুরে আসে সুন্দরী মলুয়া। নিদ্রিত চাঁদবিনোদকে দেখে তার মনে প্রেমের সঞ্চার হয়। মলুয়া কলসি নিয়ে জল ভরতে থাকে।
কিন্তু
‘জল ভরণের শব্দে বিনোদ জাগিয়া উঠিল।’
সুন্দরী মলুয়াকে দেখে চাঁদবিনোদের মনে হল –
‘জাগিয়া দেখ্যাছি কিবা নিশির স্বপন’।
এই পর্যায়ে উভয়ের মনেই পূর্বরাগের সঞ্চার হয়েছে। এরপর চাঁদবিনোদ তার মনোবাসনা দিদির কাছে জানায়। তার দিদির কাছ থেকে সব কথা শোনে চাঁদের মা। তার মা তখন মলুয়ার সঙ্গে চাঁদের বিবাহের জন্য ঘটক পাঠায়। কিন্তু চাঁদের দরিদ্র সংসারে মলুয়ার পিতা সেই বিবাহে সম্মতি দিলেন না। এরপর চাঁদবিনোদ কুড়া শিকারে যায় ও প্রচুর অর্থোপার্জন করে এবং মলুয়াকে বিয়ে করে।
কিন্তু এই কাহিনির মধ্যে আছে এক খল চরিত্র –কাজী। কাজী ষড়যন্ত্র করে চাঁদের সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে। চাঁদের সংসারে শুরু হয় অভাব-অনটন। সে অর্থোপার্জনের জন্য ভিনদেশে পাড়ি দিল কাউকে কিছু না জানিয়েই। মলুয়ার মা মলুয়াকে নিয়ে যাওয়ার জন্য অনেক চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। এদিকে বিদেশ থেকে ফিরে এল বিনোদ। তাদের সুখের সংসার আবার শুরু হল।
কিন্তু কাজীর চক্রান্তে চাঁদবিনোদের ওপর পুনরায় পরওয়ানা জারী হল। মলুয়া সব কথা জানিয়ে তার ভাইদের খবর দিল। তারা বিনোদকে উদ্ধার করল। কিন্তু কাজীর লোক মলুয়াকে হরণ করে নিয়ে গেল। তার রূপে মুগ্ধ হয়ে কাজীর দেওয়ান মলুয়াকে বিয়ে করতে চাইল। মলুয়া কৌশল অবলম্বন করে তিনমাস সময় চেয়ে নিল। এরপর পুনরায় কৌশল করে মলুয়া কাজীর প্রাণদণ্ডের হুকুম করিয়ে নিল। তারপর মলুয়ার ইচ্ছায় দেওয়ান কোড়া শিকারে বের হল। মলুয়া খবর দিল তার ভাইদের। ভাইয়েরা মলুয়াকে উদ্ধার করল এবং স্বামীগৃহে মলুয়া ফিরে এল।
কিন্তু মুসলমান সঙ্গদোষের কারণে মলুয়াকে তার সমাজ মেনে নিল না। চাঁদবিনোদ বাধ্য হল মলুয়াকে ত্যাগ করতে। সে পুনর্বিবাহ করল। এইভাবে চলার পর একদিন বনোদকে সাপে কামড়ায়। মলুয়া তাকে নিয়ে ওঝার বাড়ি যায় এবং বিনোদ প্রাণ ফিরে পায়। এই ঘটনার পরেও চাঁদবিনোদ মলুয়াকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করল। তখন মলুয়ার নিজের জীবনে বীতস্পৃহ হয়ে পড়ল। সে জলে ডুবে মরবার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হল –
‘ডুবুক ডুবুক ডুবুক নাও আর বা কত দূর।
ডুইব্যা দেখি কতদূরে আছে পাতালপুর।।’
মলুয়া এইভাবেই নিজের জীবন দিয়েছে।
আলোচক – নীলরতন চট্টোপাধ্যায়
১৯/০২/২০২৬
মলুয়া পালার কাহিনি, মহুয়া পালার কাহিনি, ময়মনসিংহ গীতিকা সম্পর্কে আপনার কমেন্ট করুন।

