অলংকার | অর্থালংকার কী কী ? | বিস্তারিত তথ্য

অলংকারের প্রথম পর্বের আলোচনায় আমরা অলংকার কী এবং শব্দালংকার সম্পর্কে নানা খুঁটিনাটি তথ্য জেনেছি। আমাদের আজকের আলোচনায় অর্থালংকার বিষয়ে জেনে নেব। এই পর্বে আমরা বিভিন্ন শ্রেণির অর্থালংকার যেমন উপমা, রূপক, উৎপ্রেক্ষা সহ সমস্ত অলংকার সম্পর্কে আমাদের ধারণা স্বচ্ছ করে নেব। আলোচনাটি পড়ে আপনার প্রতিক্রিয়া আশা করি।

অর্থালংকার ও তার শ্রেণি

এই অলংকার কাব্যের অর্থের উপর নির্ভরশীল। শব্দালঙ্কার যেখানে কাব্যের আঙ্গিকগত সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে অর্থালংকার সেখানে কাব্যের অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। এখন আমরা প্রতিটি অর্থালংকার সম্পর্কে জেনে নেব।

উপমা অলংকার

উপমা একটি সাদৃশ্যমূলক অর্থালঙ্কার। ‘উপমা’ শব্দের অর্থ হল তুলনা। সাধারণ ধর্মবাচক দুটি বিজাতীয় বস্তুর মধ্যে তুলনা করা হলে উপমা অলঙ্কার হয়। উপমার চারটি অঙ্গ থাকে –

ক. উপমেয় – যাকে তুলনা করা হচ্ছে
খ. উপমান – যার সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে
গ. সাধারণ ধর্ম – উপমেয় ও উপমানের মধ্যে বর্তমান বৈশিষ্ট্য বা ধর্ম
ঘ. তুলনাবাচক শব্দ – উপমেয় ও উপমানের মধ্যে তুলনা করার জন্য সম, মতো, সদৃশ, ন্যায় ইত্যাদি শব্দের প্রয়োগ। তবে কোনো কোনো উপমায় এই চারটি অঙ্গের কোনো একটি বা তার বেশি লুপ্ত থাকতেও পারে। কিছু ক্ষেত্রে একটি উপমেয়ের একাধিক উপমানও থাকে।

একটি উদাহরণের সাহায্যে উপমা অলঙ্কারের চারটি অঙ্গ দেখানো হল – পদ্মের কলিকা (উপমান) সম (তুলনাবাচক শব্দ) ক্ষুদ্র (সাধারণ ধর্ম) তব সৃষ্টিখানি (উপমেয়)

এরকম –

  1. ক্ষণেক শুধু অবশকায় থমকি রবে ছবির প্রায়।
  2. এতক্ষণ ছায়াপ্রায়
    ফিরিতেছিল সে মোর কাছে কাছে ঘেঁষে
  3. রাজ্য তব স্বপ্নসম গেছে ছুটে।
  4. ননীর মত শয্যা কোমল পাতা
  5. কণ্টক গাড়ি কমলসম পদতল
    মঞ্জীর চীর হি ঝাঁপি।
  6. নীরবিলা শশীমুখী
  7. মেহগনির মঞ্চ জুড়ি
    পঞ্চ হাজার গ্রন্থ
    সোনার জলে দাগ পড়ে না,
    খোলে না কেউ পাতা
    আস্বাদিত মধু যেমন
    যুথী অনাঘ্রাতা।
  8. মায়ের মুখের হাসির মতো কমলকলি।
  9. মৃত্যুর গর্জন শুনেছে সে সঙ্গীতের মতো।
  10. কালো জল ঢালিতে সই কালা পড়ে মনে।
    নিরবধি দেখি কালা শয়নে স্বপনে।।

রূপক অলংকার

এটিও একটি সাদৃশ্যমূলক অলংকার। উপমেয়ের সঙ্গে উপমানের অভেদ কল্পনা করা হলে রূপক অলংকার হয়। মনে রাখুন, এই অলংকারে উপমানের মূল্য অধিক।

যেমন –

শিশুফুলগুলি তোমারে ঘেরিয়া ফুটে

এই উদাহরণে শিশুর সঙ্গে ফুলের অভেদ কল্পনা করা হয়েছে। ‘শিশুফুলগুলি’ তাই রূপক অলঙ্কার হয়েছে।

এরকম –

  1. শোকের ঝড় বহিল সভাতে।
  2. মরণের ফুল বড় হয়ে ফোটে
    জীবনের উদ্যানে
  3. হাথক দরপণ মাথক ফুল
    নয়নক অঞ্জন মুখক তাম্বুল।
  4. থির বিজুরী নবীনা গোরী পেখনু ঘাটের কূলে।
  5. এমন মানব জমিন রইল পতিত
    আবাদ করলে ফলত সোনা।
  6. জীবন উদ্যানে তোর যৌবন কুসুমভাতি কত দিন রবে ?
  7. রূপের পাথারে আঁখি ডুবে সে রহিল।
  8. বীর্যসিংহ ‘পরে চড়ি জগদ্ধাত্রী দয়া।
  9. প্রেমের নিগড় গড়ি পরিলি চরণ সাধে।

সন্দেহ অলংকার

সাদৃশ্যমূলক অলঙ্কারের একটি। যখন উপমেয় ও উপমানের মধ্যে সংশয় থাকে তখন তাকে সন্দেহ অলঙ্কার বলে।

যেমন – 

সোনার হাতে সোনার কাঁকন কে কার অলঙ্কার ?

এই উদাহরণে উপমেয় হল ‘সোনার হাত’ এবং উপমান ‘সোনার কাঁকন’। কিন্তু এই দুইয়ের মধ্যে কে কার শোভা বর্ধন করছে তা নিয়েই কবির সংশয়। তাই এক্ষেত্রে সন্দেহ অলঙ্কার হয়েছে।

এরকম –

  1. দুই ধারে এ কি প্রাসাদের সারি, অথবা তরুর মূল।
  2. হিমাচলের শিখর ও কি শুভ্র প্রভাস্বর ?
  3. মুক্তাফলের লাবণ্য কি আমেজ দিল মুক্ত নীলাম্বরে ?
  4. কৃষ্ণমেঘের অশ্রুধারার আর্দ্র প্রেমাঞ্জন
    ক’রল কি আজ সৃষ্টি রাধার কলঙ্কভঞ্জন ?
  5. বিষ্ণুর বৈষ্ণবী কিংবা ভবের ভবানী।

নিশ্চয় অলংকার

উপমানকে অস্বীকার করে যখন উপমেয়কে প্রতিষ্ঠিত করা হয় তখন নিশ্চয় অলঙ্কার হয়।

যেমন –

কাঁপিছে এ পুরী
রক্ষোবীরপদভরে,—নহে ভূকম্পনে।

এই উদাহরণে উপমেয় ‘রক্ষোবীরপদভর’ আর উপমান ‘ভূকম্পন’। নহে শব্দ প্রয়োগের মধ্য দিয়ে উপমানকে অস্বীকার করে উপমেয়কে প্রতিষ্ঠা দেওয়া হয়েছে। তাই এটি নিশ্চয় অলঙ্কার হয়েছে।

এরকম –

  1. কণ্ঠে গরল নহ, মৃগমদসার।
  2. নাহি জটা ইহ, বেণীবিভঙ্গ।
  3. এ শুধু চোখের জল, এ নহে ভর্ৎসনা।
  4. এ নহে মুখর বনমর্ম্মরগুঞ্জিত
    এ যে অজাগর-গরজে সাগর ফুলিছে।
  5. অসীম নীরদ নয়,
    ওই গিরি হিমালয়।

উৎপ্রেক্ষা অলংকার

প্রবল সাদৃশ্যের কারণে যদি উপমানকে বাস্তব বলে মনে করা হয় তবে তাকে উৎপ্রেক্ষা অলঙ্কার বলে। মনে রাখুন, এই অলঙ্কারে সংশয়সূচক শব্দ যেন, বুঝি, প্রায় ইত্যাদির প্রয়োগ ঘটে। তাছাড়া, সন্দেহ অলঙ্কারে সংশয় থাকে উপমেয় ও উপমান উভয় ক্ষেত্রেই। কিন্তু উৎপ্রেক্ষা অলঙ্কারে সংশয় কেবল উপমানে।

যেমন – 

বসিলা যুবতী
পদতলে, আহা মরি, সুবর্ণ দেউটি
তুলসীর মূলে যেন জ্বলিল।

এই উদাহরণে ‘সুবর্ণ দেউটি’ বাস্তব বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। ‘যেন’ শব্দের প্রয়োগে সংশয় সৃষ্টি করেছে।

এরকম –

  1. সীতাহারা আমি যেন মণিহারা ফণী।
  2. পড়ুক দুফোঁটা অশ্রু জগতের ‘পরে
    যেন দুটি বাল্মীকির শ্লোক!
  3. ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়
    পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।
  4. চোখে পড়ে গেল দুটি আঁখি উৎসুক
    করুণ ক্লান্ত স্নিগ্ধ অচঞ্চল—
    নীরব পূজার যেন দুটি উৎপল।
  5. লুটায় মেখলাখানি ত্যজি কটিদেশ
    মৌন অপমানে।

ভ্রান্তিমান

অতি সাদৃশ্যবশতঃ উপমেয়কে উপমান বলে ভুল করা হলে এবং তা যদি কবিকল্পনায় অসাধারণত্ব লাভ করে কাব্যের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে তবে তাকে ভ্রান্তিমান অলঙ্কার বলে।

যেমন –

আঁখিতারা দুটি বিরলে বসিয়া
সৃজন করেছে বিধি।
নীলপদ্ম ভাবি লুবধ ভ্রমরা
ছুটিতেছে নিরবধি।।

এই উদাহরণে উপমেয় ‘আঁখিতারা’ কে উপমান ‘নীলপদ্ম’ ভেবে ভুল করা হয়েছে। এই ভ্রান্তির কারণেই অলঙ্কারটি ভ্রান্তিমান হয়েছে।

এরকম –

  1. চিরদিন পিপাসিত করিয়া প্রয়াস
    চন্দ্রকলাভ্রমে রাহু করিলা কি গ্রাস ?
  2. রাই রাই করি সঘনে জপয়ে হরি তুয়াভাবে তরু দেই কোর।
  3. তোমার মুখে গুনগুনিয়ে ভ্রমর এলো
    কমল বলে ভুল করে যে স্পর্শ ছড়ালো।

অপহ্নুতি

উপমেয়কে অস্বীকার করে যদি উপমানকে প্রতিষ্ঠা করা হয় তবে তাকে অপহ্নুতি অলঙ্কার বলে। মনে রাখুন, অপহ্নুতি অলঙ্কারে নয়, নহ, না, ছলে জাতীয় শব্দের ব্যবহার হয়।

যেমন – 

চোখে চোখে কথা নয় গো বন্ধু
আগুনে আগুনে কথা।

এই উদাহরণে উপমেয় ‘চোখ’কে অস্বীকার করে প্রতিষ্ঠা দেওয়া হয়েছে উপমান ‘আগুন’কে। ফলে এটি অপহ্নুতি অলঙ্কার হয়েছে।

এরকম –

  1. পুষ্প ও নয়, রঙীন রাগে ঝংকৃত স্বপন।
  2. ও কি ও—ঝিল্লী ? না, না, ঝুমুর ঝুমুর ঘুঙুর বাজে।
  3. হাসি যে রঙীন ধূলা, অশ্রু নয়, অভ্র সে কঠিন।
  4. নারী নহ, কাব্য তুমি, তোমা পরে কবির প্রসাদ।
  5. ষড়ঋতুছলে ষড়রিপু খেলে
    কাম হতে মাৎসর্য।

সমাসোক্তি

অচেতন বস্তুর উপর চেতনের গুণ আরোপিত হলে সমাসোক্তি অলঙ্কার হয়।

যেমন –

শুনিতেছি আজো আমি প্রাতে উঠিয়াই
আয় আয় কাঁদিতেছে তেমনি সানাই।

এই উদাহরণে অচেতন বস্তু ‘সানাই’ -এর উপর চেতনের গুণ কান্না আরোপিত হয়েছে। এর ফলে চরণটি কাব্য সৌন্দর্য লাভ করেছে।

এরকম –

  1. বসুন্ধরা, দিবসের কর্ম্ম-অবসানে,
    দিনান্তের বেড়াটি ধরিয়া, আছে চাহি
    দিগন্তের পানে।
  2. ঠকা ঠাঁই ঠাঁই কাঁদিছে নেহাই, আগুন ঢুলিছে ঘুমে
  3. ত্বরিত পদে চলেছে গেহে,
    সিক্ত বাস লিপ্ত দেহে
    যৌবন-লাবণ্য যেন লইতে চাহে কেড়ে।
  4. দেখ গো হোথায় হাপর হাঁফায় হাতুরি মাগিছে ছুটি
  5. সন্তানের শব দেখে দেশ কাঁদছে।

অতিশয়োক্তি

আলঙ্কারিকেরা বলেন, উপমার চরম পরিণতি অতিশয়োক্তিতে। উপমেয় ও উপমানের সাদৃশ্য যখন প্রবল নিকট হয় এবং উপমান উপমেয়কে গ্রাস করে নিজেই উপমেয় রূপে প্রকট হয় তখন অতিশয়োক্তি অলঙ্কার হয়।

যেমন – 

হায় শূর্পনখা,
কি কুক্ষণে দেখেছিলি তুইরে অভাগী
কাল পঞ্চবটীবনে, কালকূটে ভরা
এ ভুজগে।

এখানে উপমেয় রঘুকুলপতি রামচন্দ্র। কিন্তু উপমান ‘ভুজগ’ সেই উপমেয়কে গ্রাস করে নিজেই উপমেয় রূপে প্রতীয়মান হয়েছে। উপমেয়ের উল্লেখ এখানে তাই নেই।

এরকম –

  1. যমুনার সুবাসিত জলে
    ডুবি থাকে কালফণী দুরন্ত দংশক !
  2. বক্ষের নিচোলবাস যায় গড়াগড়ি,
    ত্যজিয়া যুগলস্বর্গ কঠিন পাষাণে।
  3. সাগরে যে অগ্নি থাকে কল্পনা সে নয়,
    চক্ষে দেখে অবিশ্বাসীর হয়েছে প্রত্যয়।
  4. আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ
    চুনি উঠল রাঙা হয়ে।
  5. আধঘুমে চাহি দেখিনু চমকি, ঝুলিছে সর্ব্বনাশী

ব্যতিরেক

যখন উপমেয়কে উপমানের তুলনায় উৎকৃষ্ট বা নিকৃষ্ট করে দেখানো হয় তখন ব্যতিরেক অলঙ্কার হয়।

যেমন – 

কণ্ঠস্বরে বজ্র লজ্জাহত

এই উদাহরণে উপমেয় ‘কণ্ঠস্বর’ আর উপমান ‘বজ্র’। এখানে উপমেয়কে উপমানের তুলনায় নিকৃষ্ট করে তোলা হয়েছে।

এরকম –

  1. কলকল্লোলে লাজ দিল আজ
    নারীকণ্ঠের কাকলি।
  2. এলো ওরা
    নখ যাদের তীক্ষ্ণ তোমার নেকড়ের চেয়ে।
  3. এ পুরীর পথ মাঝে যত আছে শিলা,
    কঠিন শ্যামার মতো কেহ নাহি আর।
  4. দেখেছে সে বাহু এক মৃণাল-নিন্দিত।
  5. কে বলে শারদশশী সে মুখের তুলা ?
    পদনখে পড়ে আছে তার কতগুলা।

এরপর আমরা জেনে নেব বিরোধমূলক অলংকার সম্পর্কে, আলোচনার পরবর্তী পর্বে।


আলোচক – নীলরতন চট্টোপাধ্যায়


বাংলা সাহিত্যের সমগ্র ইতিহাস ও ব্যাকরণের তথ্য এখন হাতের মুঠোয়। ডাউনলোড করুন আমাদের মোবাইল অ্যাপ।

Target Bangla Android App

Leave a Reply