বাংলার প্রাচীন জনপদ | গৌড় ও বঙ্গের ইতিহাস

বাংলার প্রাচীন জনপদ শীর্ষক আলোচনায় আমরা বাংলার প্রাচীন ইতিহাস থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেছি। আলোচনাটি যেমন গৌড় ও বঙ্গের ইতিহাস পরিচিতি তেমনি প্রাচীন জনপদের বর্তমান অবস্থান ও অবস্থান সম্পর্কেও জানতে পারবেন। গৌড় ও বঙ্গ থেকে আধুনিক বাংলার যাত্রার তথ্য সম্বলিত একটি আলোচনা।

বাংলার প্রাচীন জনপদ কথা

‘কহ মানসিংহ রায়  গিয়াছিলে বাঙ্গালায় / কেমন দেখিলে সেই দেশ।’

আজকের যে পশ্চিমবঙ্গ আর বাংলাদেশ ভূখণ্ড তা এককালে কেমন ছিল ? বঙ্গ ও বাংলা নামের উৎপত্তি হল কীভাবে? প্রাচীন বাংলার জনপদগুলি কী কী নামে পরিচিত ছিল ? আগের চন্দ্রদ্বীপ আজকের কোথায় ? প্রাচীন পুণ্ড্র আর আজ ? পূর্বের সমতট আজ কোথায় ? বঙ্গ বলে কি আগে আদৌ কিছু ছিল ? কী লিখেছেন হিউয়েন সাঙ, মার্কো পোলোর মতো বিদেশি পণ্ডিতেরা ?

প্রাচীন বাংলার ভৌগোলিক সীমানা

ইতিহাসের বিভিন্ন সাক্ষ্য থেকে জানা যায় খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের পূর্বের ‘বঙ্গভূমি’ আকারে ছিল অনেক বড়। অধ্যাপক নীহাররঞ্জন রায়ের লেখা থেকে আমরা জানতে পারি,

উত্তরে হিমালয় এবং হিমালয়ধৃত নেপাল, সিকিম ও ভুটান রাজ্য।

পূর্বদিকে ব্রহ্মপুত্র নদ ও তার উপত্যকা, গারো, খাসি, জৈন্তিয়া, ত্রিপুরা, চট্টগ্রাম পর্বতশ্রেণী।

পশ্চিমে রাজমহল, সাঁওতাল পরগনা, ছোটনাগপুর, মানভূম, ধলভূম, কেওঞ্জর, ময়ূরভঞ্জের শৈল ও অরণ্যময়, মালভূমি

দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর।

প্রাচীন বঙ্গভূমির এই বিশাল ভৌগোলিক সীমা থাকলেও অনেক স্থানই ছিল ঘন জঙ্গলে পরিপূর্ণ ও বসবাসের অযোগ্য। জনপদ সংখ্যায় কম। প্রাচীন বাংলায় যে জনপদগুলির নাম পাওয়া যায় তা হল বঙ্গ, গৌড়, রাঢ়, সূহ্ম, ঝাড়খণ্ড, কর্ণসুবর্ণ, বরেন্দ্র, সমতট, হরিকেল ইত্যাদি।

নামকরণ

‘গৌড়’ শব্দের উৎপত্তি নিয়ে মতভেদ আছে। অনেকে মনে করেন ঐ অঞ্চলগুলিতে প্রচুর পরিমাণে গুড় উৎপন্ন হত, তাই দেশের নাম গৌড়। আবার অনেকের ধারণা, গোণ্ড-উপজাতি থেকে এর ‘গৌড়’ শব্দের উৎপত্তি হয়েছে।

‘পুণ্ড্র’ শব্দের অর্থ এক ধরনের আখ। সে সময় আখ চাষের জন্য বিখ্যাত অঞ্চলটি পুণ্ড্র নামে পরিচিত ছিল।

সংস্কৃত শুষ্ম থেকে প্রাকৃতে ‘সূহ্ম’ শব্দটি পাওয়া যায়। তবে খ্রিস্টীয় চতুর্থ-পঞ্চম শতক থেকে শব্দটির স্থান নেয় ‘রাঢ়া’ বা ‘রাঢ়’।

‘হরিকেল’কে ‘ভারতের প্রান্তভূমি বলেছেন ই সিঙ। এই অঞ্চল ছিল সবুজ গাছপালায় ভরা। ভূমির উর্বরতার জন্য এবং কাপাস উৎপাদন ও বস্ত্রশিল্পের জন্য বিখ্যাত ছিল।

সংস্কৃত অভিধানে ‘বঙ্গ’ মানে তুলো। যে অঞ্চলে তুলো উৎপাদন বেশি হতো সেই অঞ্চলকে ‘বঙ্গ’ বলা হত। আবার মহাভারত অনুসারে, চন্দ্রবংশীয় রাজা ‘বঙ্গ’-এর নামানুসারে অঞ্চলের এই নামকরণ হয়।

বঙ্গ পরিচয়

আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন, প্রাচীনকালে বঙ্গভাষী জনগণের নিবাসভূমি প্রধান দুইটি নামে অভিহিত ছিল –  ‘গৌড়’ ও ‘বঙ্গ’ (বা বঙ্গাল)।’ গৌড় ও বঙ্গ মূলত এই দুটি প্রদেশ নিয়েই  অখিল বঙ্গদেশ।

‘গৌড়’ ও ‘বঙ্গ’ এই দুটি নামই অনেক পুরোনো। মহাভারতে ‘গৌড়’ ও ‘বঙ্গ’ এই দুটি নামেরই উল্লেখ আছে। পাণিনির ‘অষ্টাধ্যায়ী’-তে গৌড়ের উল্লেখ আছে। পতঞ্জলি বঙ্গদেশের তিনটি মুখ্য নিবাসভূমির উল্লেখ করেছেন। সেগুলি হল – বঙ্গ, সূহ্ম ও পুণ্ড্র। তাছাড়া পরবর্তীকালের ‘মানসোল্লাস’, সর্বানন্দের লেখা ‘অমরকোষ’-এর টিকায়, ‘প্রাকৃতপৈঙ্গল’-এর বেশ কিছু পংক্তিতে ‘বঙ্গ’ শব্দের উল্লেখ পাওয়া যায়। সমুদ্রগুপ্তের সভাকবি হরিষেণের প্রশস্তিতে বঙ্গ অঞ্চলের বর্ণনা আছে। তিনি বাংলাকে চিহ্নিত করেছেন  ‘সমতট’ নামে। সমতট অর্থাৎ সমভূমি। হিউয়েন সাঙও এই সমতটের উল্লেখ করেছেন।

বাঙ্গালা শব্দের আগমন

পাল ও সেন রাজারা গৌড়ের অধিপতি ছিলেন। ত্রয়োদশ শতকের প্রথম দিকে বখতিয়ার খিলজি গৌড় জয় করে যে মুদ্রা প্রচলন করেন তাতে লেখা ছিল ‘গৌড় বিজয়’।

চতুর্দশ শতকে শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ গৌড়, সমতট, বঙ্গ ইত্যাদি এলাকা দখল করেন। ১৩৫২ সাল নাগাদ তিনি নিজেকে শাহে বাঙ্গালিয়ান বলে ঘোষণা করেন। এই সময়েই প্রথম সমগ্র দেশ বোঝাতে ‘বাঙ্গালা’ শব্দের ব্যবহার হল।

চতুর্দশ শতকের শেষ দিকে মোগল বাদশা আকবরের সময় গৌড় ও বঙ্গ ‘সুবেহ বঙ্গালহ’ নামে পরিচিত হল।

অষ্টাদশ শতকের কবি ভারতচন্দ্র রায়ের অন্নদামঙ্গল কাব্যে ‘বাঙ্গালা’ শব্দটির ব্যবহার চোখে পড়ে। একটি প্রদেশের নাম বাঙ্গালা বা বাঙ্গলা তখন বহু প্রচলিত হয়ে গেছে। এরপর ক্রমাগত ধ্বনি পরিবর্তনের ফলে ‘বাঙ্গালা’ হয়েছে ‘বাংলা’। বাংলাভাষী মানুষ হয়েছে ‘বাঙালী’।

বাংলার প্রাচীন জনপদ ও বর্তমান স্থান

পুণ্ড্র – রাজশাহী, দিনাজপুর, বগুরা
বঙ্গ – ময়মনসিংহ, শ্রীহট্ট, কুমিল্লা, ঢাকা, ফরিদপুর
গৌড় – মালদা, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম ও বর্ধমানের কিছু অংশ
সূহ্ম – বর্ধমানের দক্ষিণ অংশ, হাওড়া, হুগলী, বীরভূমের কিছু অংশ
সমতট – কুমিল্লা, নোয়াখালি ও ত্রিপুরা
হরিকেল – চট্টগ্রাম, সিলেট, ত্রিপুরা
চন্দ্রদ্বীপ – বরিশাল, মুন্সিগঞ্জ
তাম্রলিপ্ত – মেদিনীপুর
কামরূপ – জলপাইগুড়ি, আসামের কিছু অংশ


আলোচক – নীলরতন চট্টোপাধ্যায়

পড়ুন – অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কে

Leave a Reply