বিহারীলাল চক্রবর্তী | ভোরের পাখি

বিহারীলাল চক্রবর্তী (২১ মে, ১৮৩৫ – ২৪ মে, ১৮৯৪) বাংলা ভাষার কবি। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে বাংলা গীতিকাব্য ধারার ‘ভোরের পাখি’ বলে আখ্যায়িত করেন। এই পোস্টে বিহারীলাল সম্পর্কিত নানা তথ্য ও প্রশ্নোত্তর আলোচিত হয়েছে।

বিহারীলাল চক্রবর্তী – সাধারণ পরিচয়

জন্ম – ৮ জ্যৈষ্ঠ, ১২৪২ বঙ্গাব্দ বা ২১ মে, ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দ, কলকাতা
পিতা – দীননাথ চক্রবর্তী
শিক্ষা – জেনারেল এসেমব্লিজ ইন্সটিটিউশন
দাম্পত্যসঙ্গী – অভয়া দেবী (প্রথমা পত্নী), কাদম্বরী দেবী (দ্বিতীয়া পত্নী)
জ্যেষ্ঠ পুত্র – অবিনাশচন্দ্র চক্রবর্তী
সম্পাদনা – পূর্ণিমা, সাহিত্য সংক্রান্তি, অবোধ-বন্ধু
উপনাম – ভোরের পাখি (রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক উদ্ধৃত), কবির কবি
মৃত্যু – ১১ জ্যৈষ্ঠ, ১৩০১ বঙ্গাব্দ বা ২৪ মে, ১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দ

গ্রন্থাবলী

গদ্য পুস্তিকা – স্বপ্নদর্শন (১৮৫৮)
গীতিকাব্য – সঙ্গীত শতক (১২৬৯ বঙ্গাব্দ বা ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দ), বঙ্গসুন্দরী (১২৭৬ বঙ্গাব্দ বা ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দ), নিসর্গসন্দর্শন (১২৭৬ বঙ্গাব্দ বা ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দ), বন্ধুবিয়োগ (১২৭৭ বঙ্গাব্দ বা ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দ), প্রেমপ্রবাহিনী (১২৭৭ বঙ্গাব্দ বা ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দ), সারদামঙ্গল (১২৮৬ বঙ্গাব্দ বা ১৮৭৯ খ্রিস্টাব্দ), বাউল বিংশতি (১২৯৪ বঙ্গাব্দ বা ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দ), সাধের আসন (১২৯৫ বঙ্গাব্দ)

কাব্য পরিচয়

১. সারদামঙ্গলঃ কবি বিহারীলালের সর্বশ্রেষ্ঠ কাব্য ‘সারদামঙ্গল’। কবি এই কাব্যের রচনা শুরু করেন ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে। কিন্তু তারপর বহুদিন কাব্যটি অসমাপ্ত থাকার পর কিছু অংশ ১২৮১ বঙ্গাব্দে ‘আর্য্যদর্শন’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। গ্রন্থাকারে কাব্যটির প্রকাশ ১৮৭৯ খ্রিস্টাব্দে।

পাঁচটি সর্গে রচিত ‘সারদামঙ্গল’ কাব্যে কবির সঙ্গে দেবী সরস্বতীর মিলন-বিরহের নানা কথা বলা হয়েছে। কাব্যে কবি তিন যুগে দেবী সরস্বতীর তিনটি রূপের পরিচয় দিয়েছেন – বৈদিক যুগ, বাল্মীকির যুগ ও মহাকবি কালিদাসের যুগ। এই সরস্বতীই কবির মানস-লক্ষ্মী রূপে দেখা দিলেও পরক্ষণেই কবি তাঁকে হারিয়ে ফেলেন। কবি যাত্রা শুরু করেন দেবীর সন্ধানে, কিন্তু কোথাও তাঁর দেখা পান না। দেবী সারদাকে হারিয়ে কবির মনে দেখা দেয় সংশয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কবি তাঁর সংশয় কাটিয়ে ওঠেন। কবি হিমালয়ের উদার প্রশান্তির মধ্যে  সারদার সঙ্গে তাঁর মিলনের আনন্দের চিত্র অঙ্কন করে কাব্যের সমাপ্তি ঘটিয়েছেন। কেউ কেউ বলেন কবি পরিকল্পিত সারদার সঙ্গে শেলির Hymn to Intellectual Beauty কবিতার মিল আছে।

এই কাব্যে কবির নিবিড় প্রেমানুভূতি ও সৌন্দর্যচেতনার পরিচয় পাওয়া যায়। কবির অঙ্কিত সারদা মায়াময়ী এক নারী। কাব্যে কবির ব্যক্তিগত সৌন্দর্য চেতনা সর্বজনীন হয়ে উঠেছে। কবির নিজের ভাষায়, ‘মৈত্রীবিরহ, প্রীতিবিরহ, সরস্বতীবিরহ যুগপৎ ত্রিবিধ বিরহে উন্মত্তবৎ হইয়া আমি সারদামঙ্গল রচনা করি।’ সুরেশচন্দ্র মৈত্র লিখেছেন, ‘কবির ব্যক্তিগত সৌন্দর্যবোধ ও নারীবন্দনা বিশ্বসৌন্দর্যবোধে ও বিশ্ব নারী বন্দনায় পরিণতি লাভ করেছে।’ রবীন্দ্রনাথ ‘সারদামঙ্গল’ সম্পর্কে লিখেছেন, ‘প্রকৃতপক্ষে সারদামঙ্গল একটি সমগ্র কাব্য নহে, তাহাকে কতকগুলি কবিতার সমষ্টি রূপে দেখিলে তাহার অর্থবোধ হইতে কষ্ট হয় না।’

২. সাধের আসনঃ জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে কবি বিহারীলালের যথেষ্ট সমাদর ছিল। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথও কবিকে সন্তান-সম স্নেহ করতেন। পরিবারের মহিলারাও কবিকে বিশেষ শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন। কবি রচিত ‘সারদামঙ্গল’ কাব্য পাঠকালে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের পত্নী কাদম্বরী দেবীর মনে কিছু প্রশ্ন জাগে – সারদার সঙ্গে কবির সম্পর্ক কী, সারদা কোনো দেবী না মানবী, তিনি কি কবির প্রেয়সী ইত্যাদি। তখন তিনি তাঁর জিজ্ঞাসু মন নিয়ে একটি সুদৃশ্য কার্পেটের আসনে সূচীকর্মে লেখেন –

‘হে যোগেন্দ্র যোগাসনে ঢুলুঢুলু দুনয়নে
বিভোর বিহ্বল মনে কাহারে ধেয়াও ?’

আসলে কাদম্বরী দেবী কবি বিহারীলালের মনের নিবিড় কথাটি জানতে চেয়েছিলেন। কবি তাঁর সেই জিজ্ঞাসার উত্তরে একটি কাব্য লিখবেন বলে প্রতিশ্রুত হন। রচনা শুরুও করেন। কিন্তু ইতিমধ্যে কাদম্বরী দেবী আত্মহত্যা করেন। বেদনার্ত কবি তখন কাদম্বরী দেবীর জিজ্ঞাসার উত্তর দিয়ে রচনা করেন ‘সাধেন আসন’। কাব্যের প্রথম সর্গটি ফাল্গুন ১২৯৫ বঙ্গাব্দে ‘মালঞ্চ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। দশটি সর্গে রচিত এই কাব্যে কবি ‘আনন্দলক্ষ্মী’র কথা বলেছেন যাকে বিশ্বাত্মা বলা যায়। তিনি এক মহাশক্তি। তিনি একাধারে জ্ঞান, চেতনা, সৌন্দর্যের প্রতিমূর্তি। কেউ কেউ বলেন, ‘সাধের আসন’ হল কবির ‘সারদামঙ্গল’ কাব্যের পরিশিষ্ট।

প্রশ্নোত্তর

১। কোন কবির কাব্যে প্রথম আত্মনিষ্ট প্রকৃতিচেতনার পরিচয় পাওয়া যায়?
উঃ বিহারীলাল চক্রবর্তী

২। বিহারীলালকে ‘ভোরের পাখি’ আখ্যায় কে ভূষিত করেন ?
উঃ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

৩। ‘কবি বিহারীলাল’ – প্রবন্ধটি কার লেখা?
উঃ ঠাকুরদাস মুখোপাধ্যায় (নব্যভারত পত্রিকা)

৪। বিহারীলাল কী নামে নিজের স্বাক্ষর করতেন?
উঃ বেহারীলাল চক্রবর্তী

৫। বিহারীলালের প্রথম রচনা কোনটি? কোন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়?
উঃ ‘স্বপ্নদর্শন’- এটি গদ্যগ্রন্থ (১৮৫৮), পূর্নিমা পত্রিকা।

৬। কোন পত্রিকা ‘স্বপ্নদর্শন’ -এর ভূয়সী প্রশংসা করে?
উঃ সংবাদ প্রভাকর

৭। বিহারীলালের ‘সঙ্গীতশতক’ (১৮৬২) কাব্যে কতগুলি গান আছে?
উঃ ১০০টি

৮। বিহারীলালের ‘বঙ্গসুন্দরী’ (১৮৭০) কয়টি সর্গ আছে?
উঃ ১০টি।

৯। ‘বঙ্গসুন্দরী’ কাব্যের প্রথম সংস্করণে কয়টি সর্গ ছিল?
উঃ ৯টি। পরে ‘সুরবালা’ নামক সর্গ সংযোজিত হয়।

১০। ‘বন্ধুবিয়োগ’- কাব্যটি কয়টি সর্গে বিভক্ত ও কী কী ?
উঃ ৪ টি – পূর্ণবিজয়, কৈলাস, সরলা ও রামচন্দ্র। (চারটি সর্গে কবি বিহারীলাল ৪ বন্ধু ও প্রথমা পত্নীর বিয়োগ ব্যথা ব্যক্ত করেছেন।

১১। ‘বন্ধুবিয়োগ’- কাব্যটি কোন ছন্দে রচিত?
উঃ পয়ার

১২। ‘বন্ধুবিয়োগ’ কাব্যের কোন সর্গে কবি স্ত্রীর বিয়োগ বেদনা ব্যক্ত করেছেন?
উঃ ‘ সরলা’- নামক সর্গে

১৩। বিহারীলালের ‘নিসর্গ-সন্দর্শন’- কোন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়?
উঃ অবোধবন্ধু পত্রিকা (১৮৭০)

১৪। ‘নিসর্গ -সন্দর্শন’- কয়টি সর্গে বিভক্ত?
উঃ ৭ টি

১৫। বিহারীলালের ‘সারদামঙ্গল’ (১৮৭৯) কয়টি সর্গে রচিত?
উঃ ৫ টি

১৬। “সারদামঙ্গল অসাধারণ কাব্য”- কার মন্তব্য?
উঃ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

১৭। বিহারীলালের ‘সাধের আসন’ (১৮৮৯) কয়টি সর্গে বিভক্ত?
উঃ ১০ টি

১৮। কবির ‘সাধের আসন’ রচনার উদ্দেশ্য?
উঃ কাদম্বরী দেবী (জ্যোতিরিন্দ্রনাথের পত্নী) কবিকে একটি আসন উপহার দেন। সেই উপলক্ষে কবি এই কাব্য লেখেন।

১৯। ‘বিহারীলাল’- প্রবন্ধটি কার লেখা?
উঃ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

২০। বিহারীলালকে ‘কাব্যগুরু’ আখ্যায় ভূষিত করেছেন কে ?
উঃ বিহারীলাল প্রবন্ধে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


Target Bangla Android App

আমাদের মক টেস্ট দিন

Leave a Reply