ধ্বনিতত্ত্ব

ধ্বনি পরিবর্তনের রীতি

বাংলা ব্যকরণের আলোচনায় একটি অন্যতম বিষয় ধ্বনি পরিবর্তনের রীতি। ধ্বনি পরিবর্তনের ধারায় আছে নানা প্রকার রীতি বা পদ্ধতি। এই আলোচনায় ধ্বনি পরিবর্তনের সেই বিভিন্ন রীতি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

ধ্বনি পরিবর্তনের রীতি

উচ্চারণের সুবিধার্থে কোনো শব্দে ধ্বনিগত বদল আসার কারণে শব্দটির যে পরিবর্তন ঘটে তাকেই ধ্বনি পরিবর্তন বলে। এই ধ্বনির পরিবর্তন স্বর ও ব্যঞ্জন উভয়ের ক্ষেত্রেই ঘটে থাকে। ধ্বনির পরিবর্তনের কয়েকটি বিশিষ্ট রীতির নাম হল – স্বরভক্তি, স্বরসঙ্গতি, সমীভবন, অপিনিহিতি, অভিশ্রুতি, বিপর্যাস ইত্যাদি। আমরা একনজরে বিভিন্ন শ্রেণির ধ্বনি পরিবর্তনের রীতিগুলি দেখে নেব।

স্বরভক্তি

যুক্তবর্ণের উচ্চারণ ক্লেশ লাঘব করবার জন্য দুটি ব্যঞ্জনের মাঝে একটি স্বরধ্বনি এনে বর্ণ দুটিকে পৃথক করবার রীতিকে স্বরভক্তি বা বিপ্রকর্ষ বলে। ধ্বনি পরিবর্তনের রীতিতে এটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

‘স্বরভক্তি’ শব্দটির অর্থ হল ‘স্বরের বিভাজন’। ‘বিপ্রকর্ষ’ শব্দের অর্থ হল ‘ব্যবধান’। ভাষাচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন, প্রাকৃতে এই রীতির ব্যবহার ছিল। প্রাচীন বাংলাতেও স্বরভক্তির বহুল প্রয়োগ দেখা যায়। উচ্চারণের সুবিধার জন্য শব্দের মধ্যে থাকা কোনো সংযুক্ত ব্যঞ্জনকে ভেঙে তার মাঝে স্বরধ্বনি আনা হলে শব্দটির ধ্বনিগত যে পরিবর্তন হয় তাকেই স্বরভক্তি বা বিপ্রকর্ষ বলে।

মনে রাখতে হবে, কবিতায় ছন্দের মাধূর্য সৃষ্টি করতে স্বরভক্তি খুবই সহায়ক। যেমন – শক্তি (শ্‌ + অ + ক্‌ + ত্‌ + ই) > শকতি (শ্‌ + অ + ক্‌ + অ + ত্‌ + ই) এই উদাহরণে ‘শক্তি’ শব্দের সংযুক্ত ব্যঞ্জন ‘ক্ত’ -এর মাঝে স্বরধ্বনি ‘অ’ এসেছে। বলা যায় এই ‘অ’ দুটি ব্যঞ্জনের মধ্যে ব্যবধান তৈরি করেছে। স্বরভক্তির আরও উদাহরণ – ধর্ম > ধরম, ভক্তি > ভকতি, প্রকাশ > পরকাশ, শ্লোক > শোলোক ইত্যাদি।

● ভক্তি কথাটির অর্থ পৃথক করে দেওয়া।
● বিপ্রকর্ষ কথাটির অর্থ ব্যবধান।
● কবিতার ছন্দ মাধুর্য রক্ষায় বিপ্রকর্ষ বড়ই সহায়ক।
● অ কারের আগম : কর্ম→ করম, জন্ম→ জনম।
● ই কারের আগম : প্রীতি→ পিরীতি, শ্রী→ ছিরি।
● উ কারের আগম : মুক্তা→মুকুতা, ব্লু→বুলু।
● এ কারের আগম : ধ্যান→ধেয়ান, ব্যাকুল→বেয়াকুল।
● ও কারের আগম : শ্লোক→শোলোক, চক্র→চক্কোর।
● ঋ কার রি ধ্বনি প্রাপ্ত : তৃপ্ত→ তিরপিত, সৃজিল→ সিরজিল।

স্বরসঙ্গতি

বাংলায়, বিশেষ করে চলিতে বা মৌখিক বাংলায়, কোনো কোনো শব্দে পূর্বস্বরের প্রভাবে পরবর্তী স্বরধ্বনির এবং পরবর্তী স্বরের প্রভাবে পূর্ববর্তী স্বরধ্বনির যে লক্ষণীয় পরিবর্তন হয়, বাংলার উচ্চারণগত এই বিশিষ্ট রীতিকে স্বরসঙ্গতি বলা হয়।

শব্দস্থিত পূর্ববর্তী বা পরবর্তী স্বরের প্রভাবে অথবা পারস্পরিক প্রভাবে ঐ শব্দের মধ্যে থাকা অন্য কোনো স্বরধ্বনি পরিবর্তিত হয়ে প্রভাবকারী স্বরের সঙ্গে সঙ্গতি স্থাপন করলে তাকে স্বরসঙ্গতি বলা হয়। এটি তিন ধরনের হয় – প্রগত, পরাগত ও অন্যন্যো।

যখন পূর্ববর্তী স্বরের প্রভাবে পরবর্তী স্বরের সঙ্গতি ঘটে তখন তাকে প্রগত স্বরসংগতি বলে। যেমন – মিঠা > মিঠে, হিসাব > হিসেব, শিক্ষা > শিক্ষে ইত্যাদি। যদি পরবর্তী স্বরের প্রভাবে পূর্ববর্তী স্বরের সঙ্গতি ঘটে তবে তাকে পরাগত স্বরসংগতি বলা হয়। যেমন – দেশি > দিশি, ঝুলা > ঝোলা, বিড়াল > বেড়াল ইত্যাদি। শুধু পূর্ববর্তী বা পরবর্তী স্বরের প্রভাবে অপর স্বরের সঙ্গতিই নয়, একটি স্বর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সেই স্বর আবার অন্য একটি স্বরকে প্রভাবিত করলে অর্থাৎ পারস্পরিক প্রভাবে স্বরের সঙ্গতিও ঘটে। এই রীতিটি অনন্যো স্বরসঙ্গতি নামে পরিচিত। যেমন – বিলাতি > বিলেতি > বিলিতি।

●পূর্বস্বরের প্রভাবে পরবর্তী স্বরের পরিবর্তন :

ইচ্ছা→ইচ্ছে, তিনটা→তিনটে,
পূজা→পুজো, তুলা→তুলো,

●পরস্বরের প্রভাবে পূর্ববর্তী স্বরের পরিবর্তন :

উড়ে→ওড়ে, শুনা→শোনা,
শিখা→শেখা, লিখে→লেখে,
বিলাতী→বিলতী,
দেই→দিই।

অপিনিহিতি

শব্দের মধ্যে বা শেষে ব্যঞ্জনযুক্ত কোনো ই কার বা ও কার থাকলে তাকে ব্যঞ্জনটির অব্যবহিত পূর্বেই উচ্চারণ করে ফেলার রীতিকে অপিনিহিতি বলে।

‘অপিনিহিতি’ শব্দটির অর্থ পূর্বে স্থাপন। যখন কোনো শব্দের মধ্যে যুক্ত থাকা ‘ই’ বা ‘উ’ নিজস্থানে উচ্চারিত না হয়ে যে ব্যঞ্জনের সঙ্গে যুক্ত তার ঠিক পূর্বে উচ্চারিত হয় এবং তার ফলে যে ধ্বনিগত পরিবর্তন হয় তাকেই অপিনিহিতি বলে। যেমন – আজি > আইজ। এই উদাহরণে ‘আজি’ শব্দে ‘ই’ যুক্ত ছিল ‘জ্‌’ ব্যঞ্জনের সঙ্গে। কিন্তু ধ্বনির পরিবর্তন ঘটে তা ঐ ব্যঞ্জনের অব্যবহিত পূর্বে উচ্চারিত হয়েছে এবং শব্দটি হয়েছে ‘আইজ’। এরকম – করিয়া > কইর‍্যা, কালি > কাইল, ভাবিয়া > ভাইব্যা ইত্যাদি।

●ই কারের অপিনিহিতি : আজি →আইজ।
● উ কারের অপিনিহিতি : সাধু →সাউধ।

অভিশ্রুতি

অপিনিহিতি জাত ই কার বা ও কার এক বিশেষ সন্ধির নিয়মে পূর্ববর্তী স্বরধ্বনির সঙ্গে মিলিত হয়ে তার রূপের যে পরিবর্তন ঘটায় , স্বরধ্বনির সেই পরিবর্তনকেই অভিশ্রুতি বলে।

● আজি→আইজ→আজ,
● মাতৃকা→ মাইয়া→মেয়ে।

য়-শ্রুতি ও অন্তঃস্থ ব-শ্রুতি

বাংলায় পাশাপাশি দুইটি স্বরবর্ণ থাকলে তাদের মধ্যে ব্যঞ্জনবর্ণের অভাবজনিত শুন্যতাটুকু পূর্ণ করবার জন্য য় কিংবা অন্তঃস্থ ব―এই যে অর্ধস্ফুট ব্যঞ্জনধ্বনির আগম হয়, তাকে য় শ্রুতি কিংবা অন্তঃস্থ ব শ্রুতি বলে।

● “বাংলায় ও-কার দ্বারা ব-শ্রুতি নির্দেশ করা হয়”― আচার্য সুকুমার সেন।
● খা+আ→খাবা→খাওয়া।
দে+আল→দেয়াল (য় শ্রুতি), দেওয়াল (ব শ্রুতি)।

সমীভবন

একই শব্দের মধ্যে বিভিন্ন ব্যঞ্জনধ্বনি পাশাপাশি থাকলে উচ্চারণের সুবিধার জন্য ধ্বনি দুইটিকে একই ধ্বনিতে, কখনো বা একই বর্গের ধ্বনিতে রূপান্তরিত করার নাম সমীভবন বা সমীকরণ।

●উদাহরণ : গল্প →গপ্প,পদ্ম→পদ্দ।

বর্ণবিকার

শব্দের অন্তর্গত কোনো মূল ধ্বনির পরিবর্তন ঘটলে তাকে বর্ণবিকার বলে।
●উদাহরণ : বাষ্প → ভাপ, গুলাব→গোলাপ।

বর্ণবিপর্যয়

চলিত বাংলায় উচ্চারণ দোষে একই শব্দের অন্তর্গত দুইটি ব্যঞ্জনবর্ণ পরস্পর স্থান পরিবর্তন করলে তাকে বর্ণবিপর্যয় বলে।

●উদাহরণ : মুকুট→মুটুক, বাতাসা→বাসাতা।

বর্ণাগম

উচ্চারণের সুবিধার জন্য শব্দের আদিতে বা শেষে নতুন বর্ণের আবির্ভাব ঘটলে তাকে বর্ণাগম বলে।
●স্বরাগম: স্পর্ধা→ আস্পর্ধা, নয়ন→নয়ান, ধন্য→ধন্যি।
●ব্যঞ্জনাগম : অম্ল→অম্বল, সীমা→সীমানা, এলা→এলাচ।

বর্ণদ্বিত্ব

অর্থের গুরুত্ব বোঝাবার জন্য শব্দমধ্যস্থ বর্ণকে দ্বিত্ব করে উচ্চারণ করবার রীতিকে বর্ণদ্বিত্ব বলে।
●সকাল→সক্কাল, মুলুক→মুল্লুক।

বর্ণলোপ

উচ্চারণ সহজ করবার জন্য অনেক সময় শব্দমধ্যস্থ এক বা একাধিক বর্ণের যে বিলোপ সাধন করা হয় তাই বর্ণ লোপ।
● র লোপ : স্মার্ট→স্মাট।
●হ কার লোপ : শিয়ালদহ→শিয়ালদা।
●ফাল্গুন→ফাগুন।

বাংলা ভাষা ও উপভাষা সম্পর্কে জানুন। আমাদের মক টেস্ট দিতে ক্লিক করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *