কাব্য সাহিত্যের রূপ ও রীতি

কাব্য সাহিত্যের রূপ ও রীতি বিচারে কাব্য বা কবিতাকে দুই ভাগে ভাগ করা যায় (১) মন্ময় বা গীতিকবিতা এবং (২) তন্ময় বা বস্তুনিষ্ঠ কবিতা। উভয়ের গঠনশৈলি ও বিভিন্ন শ্রেণি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য আছে এই আলোচনায়। সম্পূর্ণ জানতে পুরো আলোচনাটি দেখুন।

সাহিত্যের রূপ ও রীতি – মন্ময় বা গীতি কবিতা

যে কবিতায় কবি তাঁর একান্ত ব্যক্তিগত আবেগ অনুভূতিকে এক সাবলীল ও আন্তরিক গীতিপ্রবণ ভাষায় ব্যক্ত করেন তাই গীতি কবিতা বা lyric। এই ‘লিরিক’ শব্দটির উদ্ভব গ্রিক lyre শব্দ থেকে যার অর্থ ‘বীণা’।
গীতি কবিতার বিভিন্ন শ্রেণিগুলি হল – ওড বা স্তোত্রকবিতা, ব্যালাড বা গাথাকবিতা, এলিজি বা শোককবিতা, সনেট বা চতুর্দশপদী কবিতা, রাখালিয়া কবিতা, হাইকু, লিমেরিক / রঁদো / ট্রায়োলেট ইত্যাদি।

ওড

প্রাচীন গ্রিসে ধর্মীয় ও সামাজিক আচার অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে সঙ্গীত ও নৃত্য সহযোগে গাওয়া হত যেসব স্তুতিমূলক গান তা হল ওড। Pindar এই গানগুলি রচনা করে ছিলেন। গান গুলি Epode এর জটিল ত্রিস্তর ছকে বিন্যস্ত।
বাংলায় কিছু ওড হল – অক্ষয়কুমার বড়ালের ‘মানব বন্দনা’, রবীন্দ্রনাথের ‘বর্ষশেষ’ ইত্যাদি।

এলিজি

শোক কবিতা বলতে এমন রচনাকে বুঝি যে রচনায় কবির ব্যক্তিগত শোকানুভূতি অথবা বৃহত্তর সমষ্টিগত শোক কাহিনীকে।
যেমন বিহারীলাল চক্রবর্তীর ‘বন্ধু-বিয়োগ।

সনেট

সম দৈর্ঘ্যের চোদ্দটি পংক্তিতে ও একটি বিশেষ ছন্দোরীতিতে যখন কবি মনের একটি অখণ্ড ভাবকল্পনা কাব্যরূপ লাভ করে তাকে সনেট বলে।
সনেট ইতালিয় শব্দ, যার অর্থ ‘মৃদুধ্বনি’। বিশ্বসাহিত্যে পেত্রার্ক সনেটের স্রষ্টা, বাংলায় মধুসূদন দত্ত। এর দুটি অংশ অষ্টক ও ষটক।
সনেট সম্পর্কে আমাদের পেজে বিস্তারিত তথ্য পাবেন।

ব্যালাড

ইতালিয় ভাষায় ballare শব্দের অর্থ ‘নৃত্য’ তা থেকেই ফারসি ভাষার মাধ্যমে ইংরেজিতে ballad শব্দটি গৃহীত হয়েছে। গাথা কবিতা হল প্রাচীন লোকসংস্কৃতি।
যেমন – ময়মনসিংহ গীতিকা, গোপীচন্দ্রের গান ইত্যাদি।

হাইকু

ষোড়শ শতকে জাপানে তিন পংক্তির এক অতি সংখিপ্ত কবিতার উদ্ভব হয়েছিল যার নাম হাইকু।

তন্ময় / বস্তুনিষ্ঠ কবিতা

বস্তুনিষ্ঠ কবিতার শ্রেণিগুলি হল – মহাকাব্য, রূপক, ব্যঙ্গকবিতা, লিপিকবিতা, নাটকীয় একোক্তি, রোমান্স কাব্য, নীতিকবিতা ইত্যাদি।

মহাকাব্য

পৌরাণিক বা ঐতিহাসিক আখ্যানবস্তু অবলম্বনে, ভাষার ওজস্বিতায়, আয়তনে, শৌর্য-বীর্য মহত্বের যে মহাকায় বর্ণনাত্মক উপাখ্যান তাই হল মহাকাব্য।গ্রিক epicos শব্দ থেকে Epic শব্দের উদ্ভব। মহাকাব্যের উদাহরণ যেমন – রামায়ণ, মহাভারত।

মহাকাব্যের বৈশিষ্ট্য

১) মহাকাব্যের নায়ক ধীরোদাত্ত গুণ সমন্বিত – কোনো দেবতা, রাজা, উচ্চ বংশজাত হয়।
২) মহাকাব্যে কমপক্ষে ৯ টি ও সর্বাধিক ৩০ টি সর্গ থাকবে।
৩) পটভূমি হবে স্বর্গ, মর্ত্য, পাতাল প্রসারি
৪) ভাষা হবে ওজস্বী ও গাম্ভীর্যপূর্ণ
৫) শৃঙ্গার, বীর, ও শান্তরসের একটি হবে প্রধান রস। অন্য গুলি প্রধান রসের অঙ্গীরস হবে।

রূপক কবিতা

যে কাব্য কাহিনীর উপরতলের আপাত অর্থের অন্তরালে একটি গূঢ় বা বাঞ্জনার ইঙ্গিত থাকে তাকে রূপক কবিতা বলে। ফারসি allegorie ও গ্রিক allegoria র অর্থ হল ‘speaking in another way’ অর্থাৎ ‘ অন্যভাবে বলা’।
যেমন রবীন্দ্রনাথের ‘কৃপণ’ একটি রূপক কবিতা।

ব্যঙ্গকবিতা

ল্যাটিন satira বা satura থেকে এসেছে satire শব্দটি। হাসি-কন্না, আমোদ-কৌতুকের কবিতা।
যেমন – রবীন্দ্রনাথের হিং টিং ছট।


লিখেছেন – দীপক ঘোষ

Last Update on 17.02.2026

Leave a Reply